ঠিকানা রিপোর্ট : পাঁচ দিন ধরে নিখোঁজ থাকার পর নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটির অতি পরিচিত মুখ কাজী আজিজুল হক খোকন মরদেহের সন্ধান মিলেছে ব্রুকলিনে মেডিকেল এক্সামিনারের কার্যালয়ে। নিখোঁজ হওয়ার দিনই বাসার কাছে একটি বাস স্টপেজে অপেক্ষমাণ থাকার অবস্থায় হৃদরোগে তার মৃত্যু হয়েছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
দীর্ঘদিনের পরিচিত এই প্রবাসীর আকস্মিক মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে। গত ৯ অক্টোবর শুক্রবার জুমার নামাজের পর জ্যাকসন হাইটসের ডাইভারসিটি প্লাজায় অনুষ্ঠিত তার জানাজায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের ঢল নামে। বিভিন্ন শ্রেণিপেশার বিপুলসংখ্যক মানুষ জানাজায় অংশ নিয়ে তাকে শেষ বিদায় জানান। একই দিন বাংলাদেশ সোসাইটির আর্থিক সহযোগিতায় তার মরদেহ দেশের উদ্দেশে পাঠানো হয়। পরে নিজ জেলা মাগুরায় তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
কাজী আজিজুল হক খোকন প্রায় তিন দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছিলেন। জ্যাকসন হাইটসের ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে তিনি ছিলেন পরিচিত মুখ। যুক্তরাষ্ট্র শ্রমিক লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মাগুরা জেলা সোসাইটিসহ বিভিন্ন কমিউনিটি কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন তিনি। নিয়মিত কর্মস্থলে যাতায়াত, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিতি এবং মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিনের যোগাযোগের কারণে বাংলাদেশি কমিউনিটির বহু মানুষের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত পরিচয় ও সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।
গত ৩ অক্টোবর শনিবার থেকে কাজী খোকনের সঙ্গে পরিচিতজনদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নিয়মিত কর্মস্থলে না আসা এবং ফোনে যোগাযোগ করেও সাড়া না পাওয়ায় তার খোঁজ শুরু করেন বন্ধু, সহকর্মী ও কমিউনিটির নেতারা। কুইন্সের কিউ গার্ডেনসের বাসায় তিনি একাই বসবাস করতেন। তার সন্ধানে পুলিশ বাসায় যায়। হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থানে খোঁজ নেওয়া হলেও প্রথম কয়েক দিন তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
একাথিক সূত্র জানায়, গত ৩ অক্টোবর বিকেলে বাসা থেকে বের হওয়ার পর বাসার কাছে একটি বাস স্টপেজে অপেক্ষমাণ থাকা অবস্থায় রাস্তায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে যান কাজী খোকন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত কেউ জরুরি সেবায় খবর দিলে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে জ্যামাইকা হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পরিচয় ও স্বজনদের সঙ্গে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব না হওয়ায় তার মরদেহ নিউইয়র্ক সিটির অফিস অব দ্য চিফ মেডিকেল এক্সামিনারের (ওসিএমই) কাছে হস্তান্তর করা হয়। ব্রুকলিনের ৫৯৯ উইনথ্রপ স্ট্রিটে অবস্থিত ফরেনসিক প্যাথলজি অ্যান্ড ফ্যামিলি সার্ভিসেস সেন্টারে মরদেহটি রাখা হয়েছিল।
এদিকে পরিচিতজনেরা তখনো জানতেন না যে তিনি মারা গেছেন। ফলে নিখোঁজের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন পর্যায়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। তাকে খুঁজে পেতে তৎপর হন কমিউনিটির নেতারা। অবশেষে ৭ অক্টোবর বুধবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন। পাঁচ দিন ধরে যাকে জীবিত উদ্ধারের আশায় খুঁজছিলেন স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা, তার মৃত্যুর সংবাদে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েন সবাই।
বাংলাদেশ সোসাইটির সিনিয়র সহ-সভাপতি মহিউদ্দীন দেওয়ান মর্গে কাজী খোকনের লাশ শনাক্ত করেন। তার তত্ত্বাবধানেই লাশ হস্তান্তর করা হয়।
মহিউদ্দীন দেওয়ান ঠিকানাকে জানান, আগে থেকেই খোকন কিছুটা অসুস্থ ছিলেন। ফরেনসিক বিভাগ প্রাথমিক মৃত্যু সনদে উল্লেখ করেনি কী কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। তবে বাস স্টপেজে পড়ে গেলে মোহাম্মদ উদ্দীন নামে এক বাংলাদেশি ৯১১-এ কল করেছিলেন। অ্যাম্বুলেন্স এসে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তখন প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল খোকন হৃদরোগ অথবা ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছিলেন।
গত ৯ অক্টোবর শুক্রবার জুমার নামাজের পর জ্যাকসন হাইটসের ডাইভারসিটি প্লাজায় কাজী খোকনের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে রাজনৈতিক মত-পথের ঊর্ধ্বে উঠে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আঞ্চলিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীসহ বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি অংশ নেন।
জ্যাকসন হাইটসের পরিচিত এই মানুষটিকে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসেন তার দীর্ঘদিনের বন্ধু, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। জানাজায় উপস্থিত মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে তার দীর্ঘদিনের পরিচিতি ও সম্পর্কের গভীরতা ফুটে ওঠে।
জানাজায় অংশগ্রহণকারীরা মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। দীর্ঘ প্রবাসজীবনে তার সঙ্গে কাটানো সময়ের স্মৃতিচারণ করেন অনেকে। পরিচিতজনদের কাছে তিনি ছিলেন সহজ-সরল, আন্তরিক ও বন্ধুবৎসল একজন মানুষ। তার আকস্মিক চলে যাওয়াকে কমিউনিটির জন্য বেদনাদায়ক ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
কাজী খোকনের মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানোর যাবতীয় পরিবহন খরচ বহন করেছে বাংলাদেশ সোসাইটি। জানাজা শেষে একই দিন প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে তার মরদেহ দেশের উদ্দেশে পাঠানো হয়। পরে মরদেহ নিজ জেলা মাগুরায় পৌঁছালে সেখানে দাফন সম্পন্ন করা হয়।
দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করলেও শেষ পর্যন্ত জন্মভূমির মাটিতেই তার চিরনিদ্রার ব্যবস্থা করা হয়। মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যয়ভার বহন করে বাংলাদেশ সোসাইটি প্রবাসে প্রয়াত বাংলাদেশিদের পাশে দাঁড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছে।
কাজী আজিজুল হক খোকনের দেশের বাড়ি মাগুরা জেলায়। প্রায় ৩০ বছর আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। দীর্ঘ প্রবাসজীবনে তিনি বিয়ে করেননি। তার বাবা-মা আগেই মারা গেছেন। দেশে তার ভাইবোন ও অন্যান্য স্বজন রয়েছেন। নিউইয়র্কের কিউ গার্ডেনসে একা বসবাস করলেও দিনের একটি বড় অংশ কাটত জ্যাকসন হাইটসে। বাংলাদেশ স্ট্রিটে (৭৩ স্ট্রিট) অবকাশ স্টোরে কাজ করতেন তিনি। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটিতে নিয়মিত যাতায়াতের সুবাদে প্রতিদিন বহু প্রবাসী বাংলাদেশির সঙ্গে তার দেখা ও কথা হতো।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও তার দীর্ঘদিনের সক্রিয়তা ছিল। যুক্তরাষ্ট্র শ্রমিক লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। তার মৃত্যুতে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমানসহ রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনের বিভিন্ন ব্যক্তি শোক প্রকাশ করেছেন।
কাজী খোকনের মৃত্যু নিউইয়র্কের প্রবাসী বাংলাদেশিদের সামনে একাকী প্রবাসজীবনের বাস্তবতাকেও নতুন করে তুলে ধরেছে। তিন দশক ধরে যে মানুষটি কমিউনিটির অসংখ্য মানুষের পরিচিত ছিলেন, তার মৃত্যুর খবর জানতে লেগেছে পাঁচ দিন। অথচ তিনি নিখোঁজ হওয়ার দিনই হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
প্রবাসে পরিবার থেকে দূরে বা একা বসবাসকারী মানুষের আকস্মিক অসুস্থতা ও জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত পরিচয় শনাক্ত, স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়টি এ ঘটনায় নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।
কাজী খোকন আর ফিরবেন না জ্যাকসন হাইটসের চেনা কর্মস্থলে, দেখা যাবে না কমিউনিটির নিয়মিত আড্ডা কিংবা সামাজিক-রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে। তবে ডাইভারসিটি প্লাজায় তার শেষ বিদায়ে মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি প্রমাণ করেছে, দীর্ঘ প্রবাসজীবনে তিনি বহু মানুষের স্মৃতিতে নিজের একটি জায়গা তৈরি করে গেছেন।